অপেক্ষার তিন দশক পেরিয়ে শিরোপায় চুমু রেড ডেভিলদের

0
1322

রাতগুলো কেটে গেল
নতুন সূর্যের অপেক্ষায়,
লাল জার্সিটা পড়ে রইল
সোনালী ট্রফির প্রতীক্ষায়!

“সবুরে মেওয়া ফলে” প্রবাদ শোনে নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, নেই বললেও ভুল বলা হবে না। অপেক্ষার ফলাফল বড়ই সুমিষ্ট! প্রেমিকার পানে চেয়ে বছরকে বছর পার করে দেওয়া প্রেমিক বুঝবে অপেক্ষার মানে। ফসল ফলাতে বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকা কৃষক বুঝবে অপেক্ষার মানে। তবে শিরোপার জন্য অপেক্ষার প্রকৃত মানে লিভারপুল সমর্থক ছাড়া আর কারাই বা বুঝবে..? চাতক পাখি যেমন অপেক্ষা করে থাকে একটুখানি বৃষ্টির, লিভারপুলের খেলোয়াড়-সমর্থকদের চাতক পাখির মতো তিন দশকের অপেক্ষা বৃষ্টি নামক একটা লীগ শিরোপার। সেই চাতক পাখি দেখা পেয়েছে বৃষ্টির, আর লিভারপুল সেই কাঙ্খিত লীগ শিরোপার।

“এমন অনেক দিন গেছে আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি, হেমন্তে পাতা ঝরার শব্দ শুনব বলে নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে”, উক্তিটি রফিক আজাদের না হয়ে যদি কোনো লিভারপুল সমর্থকের হতো তাহলে কি খুব বেশি ভুল হতো?
-হয়তো না!
অপেক্ষা হলো শুদ্ধতম ভালবাসার প্রতীক। আর এই শুদ্ধতম ভালবাসার প্রতীকী চরিত্র এনফিল্ডের সব সমর্থকেরা! এনফিল্ডের প্রতিটি ঘাসে ঘাসে ভালোবাসার এক রূপকথার গল্প লেখা, যে গল্পের নায়ক কিন্ত তারাই, যাদের জন্য লিভারপুল ক্লাবের দিগন্ত পেরিয়ে কড়া নারে অনুভূতির দরজায়। সত্যিকার অর্থে লিভারপুল শুধুই একটা ক্লাব নয়, এ এক চিরন্তন অনুভূতি!

জীবনে সুখের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে দুঃখের ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না নিয়েই আমাদের জীবন। কলকাতার প্রাক্তন সিনেমায় একটা ডায়লগ আছে, ‘তুমি যাকে ভালবাসো তার সবটা নিয়ে ভালবাসবে। তার ভালটাকে ভালবাসবে আর খারাপটাকে বাসবে না তাতো হয় না। আমি অতীতটাকে যেমন নেব, বর্তমানকেও নেব, ভবিষ্যতটাকেও ভালবাসবো।’ এ যেন লিভারপুল সমর্থকদের একদম মনের কথা! সুখ-দুঃখকে তারা মিলিয়েছে এক বিন্দুতে। ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টের একসময়ের হার্টথ্রব লিভারপুল এবার লীগ শিরোপা জিতেছে তিন দশকের অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে। মাঝের সময়টা ছিল শুধুই দীর্ঘশ্বাস! তবুও কখনো ভালবাসার অনুভূতিকে ভুলে গিয়ে দূরে সরে যায় নি “রেডডেভিল আর্মিরা”! বর্ণিল অতীত ফেলে আসা ধূসর রেডডেভিলদের তিন দশকের অপেক্ষা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখার। হয়তো তাদের মনে একটাই সুর বাজে, “লিভারপুল ইজ নট অনলি এ ক্লাব, ইট’স বাট অলসো এ নেইম অব ফিলিংস!”

এনফিল্ডের মূল ফটকে একটা বার্তা বইছে, “ইউ উইল নেভার ওয়াক এলোন!” আসলেই রেডডেভিলরা কখনো একা চলে না। যেদিন থেকে আপনি হয়ে গেলেন একজন লাল সৈনিক, সেদিন থেকে আপনার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা জুড়ে বইতে শুরু করেছে ঐক্য! সেদিন থেকেই আপনার মনে একতার জয়গান বাজতে থাকবে।

গত শতাব্দীর আশির দশকে একেরপর পর এক শিরোপা শো-কেসবন্দি করা এনফিল্ডেও এসেছিল একসময় মরুর ছোঁয়া! এনফিল্ডে খরা নেমেছিল। এ খরা শিরোপার! তিন দশকের অপেক্ষায় সেই খরা ঘুছল! গত তিন দশকজুড়ে ছিল শুধুই স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস, বেদনার উপাখ্যান! তবুও অযত্ন-অবহেলা-অনাদরে কখনো প্রিয় ক্লাবকে দূরে সরিয়ে রাখে নি এনফিল্ডের এই অকৃত্রিম সমর্থকেরা! সবসময় পাশে থেকে সমর্থন করে গেছে, বিনিময়ে চায়নি কিছুই! বিখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকির সুরে সুর মিলিয়ে হয়তো রেড ডেভিল আর্মিরাও বলত, “নেভার গিভ আপ!”

প্রতিবার ব্যার্থতায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, প্রতিবার দ্বিগুন মানসিক শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে লিভারপুল, যার নেপথ্যের নায়ক বলুন কিংবা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াই বলুন, সবই করেছে নিখাঁদ ভালবাসার ওই রেডডেভিলরা! দশকের পর দশক ধরে লড়াই করার রসদ জুগিয়েছে তারাই! লিভারপুলের অভিধানে একটাই শব্দ, ‘লড়াই’! তিন দশকজুড়ে এনফিল্ডের লাল চেয়ারের প্রতিটি কোনায় লেখা আছে লড়াই, এ লড়াই শুধুই যে খেলোয়াড়-কোচদের তা নয়! মাঠের লড়াই ছাপিয়ে আসল লড়াই ছিল সমর্থকদের, অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে, এই যুদ্ধে বিজয়ীর খাতায় এবার একটাই নাম উঠবে, “রেডডেভিল আর্মি”!

আকাশে ঘন কালো মেঘ হয়, সেই কালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে, মেঘ সরে যায়। আকাশের ঘন কালো মেঘ সরে গিয়ে ফকফকা নীল হয়ে যায়। সেই নীল আকাশে তখন দেখা মিলে রংধনুর! লিভারপুলের আকাশেও গত তিন দশক ধরে এক ঘন কালো মেঘ বাসা বেঁধেছিল! সেই কালো মেঘ সরে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরেছিল সেদিন, যেদিন চৌদ্দ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপায় চুমু একে দিয়েছিল ক্লুপ বাহিনী! এবার সেই আকাশে রঙধনুর দেখা মিলল! যে রঙধনুর জন্য অপেক্ষা তিন দশকের। অপেক্ষার ফলাফল যে বড়ই সুমিষ্ট, তাই নয় কি?