আক্ষেপের এক নাম “রনি তালুকদার”

0
14845

 

২০১৫ সালের ৭ই জুলাই, মিরপুর!
আট ম্যাচে স্কোয়াডে থেকেও সুযোগ না পাওয়া ২৪ বছর বয়সী এক তরুণ খেলতে নামে তার অভিষেক ম্যাচ। অভিষেকের আগে গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি ছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত পারফর্মার, পরীক্ষিত সৈনিক। ঘরোয়া ক্রিকেটে টপ-অর্ডারে ব্যাটিং করা ওই তরুনের অভিষেক ম্যাচের ব্যাটিং পজিশন ছিল নাম্বার সেভেন । ভাবা যায়? একজন টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান কিনা ব্যাটিং করছেন লেট-অর্ডারে। ১৭০ রানের টার্গেটে ব্যাটিং করতে নামা বাংলাদেশ দলের হয়ে এই তরুণ ক্রিজে আসেন ইনিংসের বারোতম ওভারের শেষ বলে। স্কোরবোর্ড তখন দেখাচ্ছে ৮২-৫! শেষ ওভারের প্রথম বলে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে কাইল এবটের বলে বোল্ড হয়ে আউট হওয়ার আগে করেছেন ২২ বলে দলীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১ রান। তাতে ছিল লং অনের উপর দিয়ে মারা এক বিশাল ছক্কা । সেদিন এই তরুণের ব্যাটিংয়ে অনেকেই দেখেছিলেন কনফিডেন্স। ৩১ রানে পরাজিত হওয়ার ম্যাচে দলীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরারকে নিশ্চয়ই পরের ম্যাচে সুযোগ দিবেন যেকেউ! কিন্তু এই তরুণের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের যবনিকা পাত ঘটল শুরুতেই । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওই তরুণের সম্বল বলতে যে ওই একটাই ম্যাচ।

বলছিলাম ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে বছর দুয়েক ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে সবার মুখে মুখে যার নাম উচ্চারিত হয়েছে সেই রনি তালুকদারের কথা। ২০১৪-২০১৫ বছর দুই ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে রনি রান করেছেন ২৬০১! ভাবা যায়? কোনো বাংলাদেশি দুই সিজনে রান করবেন আড়াই হাজারেরও বেশি। আড়াই হাজারের উপর রান করা রনিকে সবাই ভাবতে শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ টেস্ট দলের ভবিষ্যতের নায়ক, এর বাইরে সর্বোচ্চ ওয়ানডে দলে ছড়ি ঘুরাবেন তিনি। সবাইকেই অবাক করে রনির অভিষেক হলো টি-টুয়েন্টিতে। তাও একটা ম্যাচের জন্য!

ঘরোয়া ক্রিকেটে সাম্প্রতিককালে যে কজন নিয়মিত পারফর্ম করে যাচ্ছিলেন, রনি তাদের একজন। ২০০৮ সালে খেলেছেন অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ। ২০১৮ সালে ষষ্ঠ বিপিএলে খেলেছিলেন ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে। দলকে করেছিলেন রানার-আপ।সেই আসরে ১৫ ম্যাচে তিন অর্ধশতকে রান করেছিলেন ৩১৭, সাথে ছিল ঈর্ষনীয় স্ট্রাইক রেট (১৪০.২৬)! এই রান করে হয়েছিলেন টুর্নামেন্টে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, দেশের মধ্যে যা ছিল তৃতীয়। তবুও পাননি দ্বিতীয় সুযোগ।
২০১৮-১৯ মৌসুমে এনসিএলে চার ম্যাচে ৪২৬ করে পঞ্চম আর বিসিএলে ছয় ম্যাচে ৪৬০ রান করে হয়েছিলেন চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। তবুও মেলে নি নিজেকে নতুন করে চেনানোর সুযোগ।

৮৪টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে ৩৫.২০ গড়ে করা ৪৭৫২ রান তাকে দেয় নি দ্বিতীয় সুযোগ, সাথে ১০টি শতক আর ২২টি অর্ধশতক আক্ষেপের মাত্রাই বাড়িয়েছে শুধু।
১১১টি লিস্ট-এ ম্যাচে ৩টি শতক আর ১১টি অর্ধশতকে করা ২৭৭৯ রান কষ্টের পাল্লাই ভারি করেছে শুধু।

ঘরোয়া ক্রিকেটে ৮৪৩৪ রান, ১৩টি শতক, যার তিনটি ছিল আবার দ্বিশতক, ৩৬টি অর্ধশতক আক্ষেপের মুকুটে একটা পালক যুক্ত করেছে।

১৯৯০ সালের ২৯শে মে নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা এই ব্যাটসম্যানের বর্তমান বয়স ত্রিশ। জাতীয় দলের জার্সি কখনো আর গায়ে জড়ানো হবে কিনা কে জানে। বয়সের উর্ধমূখীতার সাথে সাথে তার পারফরম্যান্সের গ্রাফ যে নিম্নমুখী, সর্বশেষ বিপিএল-বিসিএলে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন। তবে সর্বশেষ ম্যাচে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে করেছেন ৭৯ রান, দিয়েছিলেন ফিরে আসার ইঙ্গিত। কখনো সেই পুরোনো রূপে ফিরে আসবেন কিনা কে জানে। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে রনি কখনো আর বাইশ গজে তালুকদারি করতে পারেন কিনা সেটা না হয় ভাগ্যের হাতেই থাকুক।

লেখকঃ আসিফ আফনান পিয়াল