টেস্টের নান্দনিকতা কিংবা ক্লাসিক্যাল কেভিন পিটারসন

0
1245

ক্রিকেটের সবচেয়ে রাজকীয় ফরম্যাট কোনটা?
দুবার না ভেবেই সবার উত্তর একবিন্দুতেই মাইল যাবে!
-টেস্ট ক্রিকেট!
১৮৭৭ সালে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়, ১৩৪বছর পর তা পৌঁছে দু’হাজারতম ম্যাচে! যে ম্যাচ ছিল ভারত-ইংল্যান্ডের শততম টেস্ট লড়াই!

২৬শে জুলাই,২০১১!
নয় বছর আগে আজকের দিনে লর্ডসে ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়েছিল ভারতের । ‘হোম অব ক্রিকেটে’ চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ শুরু হয় সেদিন।সেটা আবার ছিল ইংল্যান্ড দলের তৎকালীন কোচ ডানকান ফ্লেচারের কোচিং ক্যারিয়ারের ১০০তম টেস্ট। আর উপরি পাওনা হিসেবে ছিল শচীনের শততম সেঞ্চুরির আরেকটি সম্ভাবনা!

ম্যাচশুরুর রাত থেকেই লর্ডসের আকাশ ভেঙে নেমেছিল গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, উইকেট ঢাকা ছিল সকাল থেকেই! বৃষ্টির দরুন আধাঘন্টা দেরিতে হয় টস। টস জিতে স্বভাবসুলভ ভাবেই বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ধোনি। মেঘলা আবহাওয়ার দরুন উইকেটের ময়েশ্চার কাজে লাগিয়ে দারুন শুরু করেছিল প্রবীণ কুমার, জহির খানরা!
দলীয় ১৯ রানে জহির খানের ইনসুইংগারে এলবিডব্লিউর শিকার হয়ে কুকের বিদায়। দলীয় ৬২ রানে আবারো জহির খানের আঘাত! এবার শিকার ইংলিশ দলপতি এনড্র স্ট্রাউস! ক্রিজে নতুন ব্যাটসম্যান কেভিন পিটারসন।

পাহাড়সম চাপ মাথায় নিয়ে ক্রিজে আসলেন কেপি। তিন বছর ধরে ঘরের মাঠে তিন অঙ্কের দেখা পাননি তিনি। সর্বশেষ ঘরের মাঠে তিন বছর আগে ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শতকের দেখা পাওয়া কেপি এদিন ছিলেন বড্ড নার্ভাস! জহির খান, প্রবীণ কুমারদের মুভমেন্ট নাকানি চুবানি খাওয়াতে শুরু করে কেপিকে! কয়েকবার আউট-সাইড-এজ মিস করে ধোনির গ্লাভসে বল আশ্রয় নেয়। তারউপর দলীয় ৭৭ রানে ব্যক্তিগত ৩ রানে প্রবীণ কুমারের বলে আউট সাইডেজে গালি দিয়ে মারেন চার, যে চার তাকে স্বস্তির বদলে দিয়েছিল নাভিশ্বাস! চাররান পরে আবারো প্রবীণ কুমারের বলে আউট সাইড এজ, আবারো চার। এবার স্টেপ আউট করে অন ড্রাইভ মারতে চেষ্টা করলেন কেপি। ফলাফল, আরেকবার নার্ভাসনেসে কাটা পড়লেন কেপি! দলীয় ১৩৫ রানে নিজের ইনিংসের ৮৭তম বলে পায়ের দারুণ ব্যবহারে মিডঅন দিয়ে ইশান্ত শর্মাকে মারা চারে অবশেষে কেপি’কে খুঁজে পাওয়া গেলো। কেপি প্রথমবারের মত ছন্দ খুঁজে পেলেন। আহা! মাঝ ব্যাটের সেই সুর! ইশান্ত শর্মাকে জোনাথন ট্রাটের পাশ দিয়ে মিডঅনে মারলেন সজোরে ড্রাইভ। ফলাফল চার। সেই শুরু! তারপর একেএকে ছিন্নভিন্ন করেছেন ভারতীয় বোলিং লাইনআপ। বাদ যাননি ধোনিও। তাকেও মেরেছেন স্ট্রেইট ড্রাইভ করে চার। প্রবীণ কুমারকে স্কয়ার লেগে ফ্লিক করে পূরণ করলেন অর্ধশতক। সাথে দিলেন ঘরের মাঠে রানে ফেরার পূর্বাভাস!

ইংল্যান্ডের রানসংখ্যা তখন ২৬৩-৩! ৯৮রানে অপরাজিত কেপি ইশান্ত শর্মাকে স্ট্রেইট ড্রাইভ করে মারা চারে তুলে নেন শতক। এক বল পরে আবার সেই শুরুর নার্ভাস কেপি, এবার সেকেন্ড স্লিপের পাশ দিয়ে বলের ঠিকানা থার্ডম্যান! প্রবীণ কুমারকে অন ড্রাইভ করে পূরণ করেন ১৫০! পরে রায়নাকে তার মাথার উপর দিয়ে সাইট স্ক্রিনে চার, পরের বলে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে হাঁকালেন, বলের ঠিকানা সাইট স্ক্রিনে! বিলি বাউডেন তার দু হাতের আঙ্গুল বাঁকা করে জানিয়ে দিলেন এটা ছক্কা। সেই অপরাজিত ২০২ রানের ইনিংসে স্টিম-রোলার চলেছে সবার উপর। ইশান্ত শর্মা বাদ যাননি, যাননি প্রবীণ কুমার, হরভজন সিংও! ছেড়ে কথা বলেননি জহির খানকেও! সুরেশ রায়নাকে পয়েন্ট অঞ্চল দিয়ে দারুণ এক স্কয়ার কাট শটে চার মেরে ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছেন কেপি! অপেক্ষায় ছিল সব ক্যামেরাম্যান! একেকটা ক্যামেরা উদযাপনে মত্ত কেপিকে বন্দি করেছিল স্থিরচিত্রে, একেকটা ক্লিক তৈরী করছে দিনের সেরা ছবি! একেই বাইশ গজে কেপির সুরের মূর্ছনা, তার উপর কমেন্ট্রি বক্স থেকে হার্শা ভোগলে তাতে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করলেন,
“He can be mighty proud of this. Gone Kevin Peterson. Go…Go…Go throw the celebration. Because you deserve it KP!”

সকাল দেখেই আপনি সবসময় দিনের পূর্বাভাস দিতে পারবেন না, যেমনটা এই ইনিংসের শুরুর নার্ভাস কেপিকে দেখে ইনিংসের বাকি সময়ের কেপিকে বিবেচনা করতে। আপনি ধুন্ধুমার টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের ভক্ত হতে পারেন, তবে আপনি ক্লাস ভালোবাসলে, ক্রিকেটে ক্লাসিকাল মিউজিক শুনতে চাইলে আপনাকে ফিরে আসতে হবে টেস্ট ক্রিকেটের মঞ্চে। আপনার কেপির রিভার্স সুইপ ভাললাগতে পারে, কিন্তু আমার চোখে কেপির অন ড্রাইভ একদম চোখের শান্তি- একদম শিল্প। আর এই শিল্পের শিল্পি কেপি।