নাসির হোসেন: স্বপ্ন দেখিয়েও পথভ্রষ্ট যে ফিনিশার

0
1399

“তুমি সুখ যদি নাহি পাও,
যাও সুখের সন্ধানে যাও,
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে,
আর কিছু নাহি চাই গো!”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কালজয়ী গান শোনেনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর! ব্যক্তিজীবনে তো বটেই এই গানের মাহাত্ম্য আছে ক্রিকেটেও। এই গানের প্রতিটা লাইন যেন মিলে যায় ক্রিকেটার নাসির হোসেনের এর সাথে।

ওয়ানডে ক্রিকেটে সাধারণত নাম্বার সিক্স পজিশনে ব্যাটিং করা ব্যাটসম্যানরা ফিনিশিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। মাইকেল বেভান, মহেন্দ্র সিং ধোনি কিংবা হালের বেন স্টোকস ফিনিশিংয়ে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করায় পেয়েছিলেন “ফিনিশার” উপাধি। এই ফিনিশাররা সাধারণত ব্যাটিং করতেন ছয় নম্বর ব্যাটিং পজিশনে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেরও ছিল একজন ফিনিশার! নামটা কারোই অজানা নয়; নাসির হোসেন।

নাসির হোসেন তার ক্যারিয়ারের ৬৫ ওয়ানডে ম্যাচের বেশিরভাগ ম্যাচেই ব্যাটিং করেছেন ছয় নম্বর ব্যাটিং পজিশনে। ছয় নম্বরে নেমে পাঁচশর বেশি রান করা চার জন ব্যাটসম্যানের একজন তিনি। ছয় নম্বরে নেমে সর্বোচ্চ ১০৩৮ রান মুশফিকুর রহিমের। তারপর আছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (৮৯৩), নাসির হোসেন (৫৬৫) ও সাব্বির রহমান (৫৩৪)। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং গড় কার জানেন? হ্যাঁ, একসময়ের ফিনিশার নাসির হোসেনের (৪৭.০৮)! ক্যারিয়ারের শুরুতে ফিনিশারের তকমা পাওয়া নাসির ছয়ে নেমে করেছেন তিনটি অর্ধশতক ও একটি শতক। ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজের একমাত্র শতকটি তার এসেছে এই ছয় নম্বর পজিশনে পাকিস্তানের বিপক্ষে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ছয় নম্বর পজিশনে খেলেছিলেন ৫৯ বলে ৭৩ রানের এক ক্যামিও।

(Photo by Robert Cianflone/Getty Images)

নাসির হোসেন ওয়ানডে ক্রিকেটে ৬৫ ম্যাচ খেলে করেছেন ১২৮১ রান। ছয় নম্বর পজিশনে মাত্র ১৬ ম্যাচ খেলে করেছেন ৫৬৫ রান, যা তার ক্যারিয়ারের মোট রানের প্রায় অর্ধেক (৪৪%)!
ছয়ে নেমে নাসিরের গড় তার টোটাল গড় ২৯.১১ এর থেকে প্রায় দ্বিগুণ!

বাংলাদেশ ক্রিকেট যখন একজন ফিনিশারের অভাব বোধ করছিল তখন দেবদূত হিসেবে আবির্ভূত হন নাসির হোসেন। ২০১১ তে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেকের পর টানা তিন-চার বছর ফিনিশারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ক্যারিয়ারের পিক টাইমে, যখন “উদীয়মান নাসির হোসেন” থেকে “সিনিয়র নাসির হোসেন” হবেন ঠিক সেই মুহূর্তেই কোনো এক অজানা কারণে নিজের প্রিয় ছয় নম্বর পজিশন হাতছাড়া হয়ে যায় তার। ক্যারিয়ারের বাকি সময় বেশিরভাগ ম্যাচেই খেলছেন সাত-আট নম্বরে। একপর্যায়ে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েন তিনি।

জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লেও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট এবং লিস্ট এ ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে যাচ্ছেন নাসির হোসেন। ২০১৯-২০ এনসিএলে ছয় ম্যাচে ৫১ গড়ে করেছেন ৪৬০ রান, হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ অর্ধশতকের রেকর্ড ছিল তার দখলে।
২০১৭-১৮ এনসিএলে খেলেছিলেন ২৯৫ রানের ম্যারাথন ইনিংস। যা ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশির তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস!
২০১৮ ডিপিএলে আট ম্যাচে ২৪০ গড়ে করেছিলেন ৪৮০ রান

এনসিএলে ২৯৫ রানের পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক টেস্টে খেলার সুযোগ। যেখানে প্রথম ইনিংসে লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে খেলেছিলেন দলীয় তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪৫ রানের ইনিংস! তবুও সুযোগ অধরা রয়ে গেছে। ২০১৭ বিপিএলে ভালো খেলার পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের শেষ ম্যাচে খেলার সুযোগ, যেখানে ব্যাটিং নেমেছিলেন আট নম্বরে, বোলার আবুল হাসান রাজুরও পরে।

কবিগুরুর ওই গানের ভাষায় বললে, নাসির আমাদের ফিনিশিংয়ের সুখ দিলেও আমরা সেই সুখকে অবজ্ঞা করেছি, ফিনিশার নামক নতুন সুখের সন্ধানে বেরিয়েছি। ক্রিকেটকে হৃদয়মাঝে ধারণ করে নাসির ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে গেছেন। তবুও অজানা এক কালো থাবায় আজও দলের বাইরে নাসির।

লেখকঃ আসিফ আফনান পিয়াল