পাড় করা সাঁইত্রিশ বসন্তের শুভেচ্ছা

0
2150

এই গল্পটা মাশরাফির…

নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামের চিত্রা নদীর পাশের এলাকাগুলোর ছেলেপেলের দুরন্ত দস্যিপনা যেখানে শেষ, ছোট্ট কৌশিকের সেখান থেকে শুরু। চিত্রা নদীতে সবার দাপাদাপি যখন শেষ, ছোট্ট কৌশিকের তখনো ঘন্টাখানেক দাপাদাপি করা বাকি। কিন্তু এই নদীর মায়াকে উপেক্ষা করে গ্রামের সেই ছোট্ট কৌশিক থেকে কখন যে ব্যাট বলের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে তা হয়তো মাশরাফির কাছেও অজানা।

মাশরাফি বিন মর্তুজা যে নামটা বাংলাদেশ ক্রিকেটে জাদুর কাঠির মতো। যার ছোঁয়ায় বাংলার ক্রিকেট পেয়েছে নব পথের খোঁজ। যিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দেয়া একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। মাশরাফি নামক জাদুর কাঠির ভাগ্য যখন ইঞ্জুরির থাবায় হারিয়ে যেতে বসেছিলে তখনই তিনি তার শক্ত মনোবলকে হাতিয়ার করে রাতের পর রাত অসহ্য যন্ত্রণার পরও চোখের জল মুছে ছুটে চলছেন নব আঙ্গিকে, নব উদ্যমে, দুর্দান্ত গতিতে!!

মাত্র এগারো বছর বয়সে নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে যে পথচলা মাশরাফি শুরু করেছেন তা এখনো চলছে এক্সপ্রেস গতিতে। এর মাঝে ১৯৯১ সালে মাগুরায় হয় বিকেএসপির ক্যাম্প। সেখানে ওই বয়সে গতি ও সুইংয়ের খেল দেখিয়ে সুযোগ পেয়ে যান খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে। তারপরেই শুরু হয় কৌশিক থেকে একজন ক্রিকেটার, একজন বোলার মাশরাফি বিন মর্তুজা হয়ে ওঠার গল্প।

৮ নভেম্বর, ২০০১

ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সাদা পোষাকের টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে পথচলা শুরু হয় মাশরাফির। তখনকার পরাশক্তি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে চার উইকেট নিয়ে নিজের আগমনী বার্তা বুঝিয়ে দেন দেশের প্রথম গতিমানব। একই মাসে লাল সবুজের জার্সি গায়ে একদিনের ক্রিকেটেও পথচলা শুরু হয় মাশরাফির। সেই ম্যাচেও দারুণ বোলিংয়ে দলীয় সর্বোচ্চ উইকেট নেন। কিন্তু পরের বছরই ইঞ্জুরি থাবা বসায় মাশরাফির উপরে।

নড়াইলে থাকাকালীন গাছে থেকে পড়ে অপারেশনের জন্য যেতে হয় চেন্নাইতে। পরের বছর আবারও চোট। ছিঁড়ে যায় লিগামেন্ট। যার জন্য দুই দফায় ছুরি কাঁচির নিচে যেতে হয়।

২৮ নভেম্বর, ২০০৬

ইঞ্জুরিতে আক্রান্ত হওয়া কিংবা বাইশ গজে গতির ঝড় তুলে কারো স্টাম্প ওড়ানো এসবের মাঝেই দেশের প্রথম টি-২০ ম্যাচে অভিষেক হয় মাশরাফির। অভিষেক ম্যাচেই টাইটফিট বোলিং ফিগার এবং জিম্বাবুয়ের বেন্ডন টেইলরের স্টাম্প উড়িয়ে ম্যাচ সেরা হন মাশরাফি।

কিন্তু এরপরেও ইঞ্জুরি পিছু ছাড়েনি মাশরাফির। ছোট বড় মিলিয়ে মোট সাতটি অস্ত্রোপচার করতে হয় তার হাঁটুতে। এই সাতটি অস্ত্রোপচারের মধ্যে জীবনের অনেক সোনালী সময় হারিয়ে ফেলেছেন মাশরাফি। ভাগ্য তাঁর কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছে ঘরের মাঠে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ। তবে, সৌভাগ্যবশত গত কয়েক বছর ছুরি কাঁচির নিচে যেতে হয়নি তাঁকে। তবে এখনো একটু পরিশ্রম করলে তাঁর হাঁটু ফুলে যায়। খেলা শেষে সিরিঞ্জ দিয়ে হাঁটুতে জমে থাকা বিষাক্ত রস বের করতে হয়। ঘুম থেকে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকেও উঠতে পারেন না। তবে নিজের চোট যুদ্ধকে আড়াল করে টিভির পর্দায় দেখা যায় অদম্য এক মাশরাফিকে। অনেকটা রুপালি পর্দার সেসব চরিত্রের মতো। যারা পর্দার বিনোদনদায়ী চেহারার মাঝে ঢেকে রাখেন বাস্তব জীবনের কষ্টগুলো। এত ইঞ্জুরি কষ্টের মাঝেও বল হাতে প্রতিপক্ষের উইকেট ছিন্নভিন্ন করে কিংবা দেশ জিতলে উল্লাসে মেতে ওঠেন। ঢাকা পরে যায় পর্দার পেছনে মাশরাফির সংগ্রামের গল্প।

ব্যথানাশক ওষুধ আর ইনজেকশনকে নিজের সঙ্গী বানিয়ে দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক হয়ে উঠেছেন মাশরাফি। তাঁর ছোঁয়াতে বদলে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। পুরো দলের প্রেরণার বাতিঘরও বলা চলে। দলের যেকোন মুহূর্তে, যেকোনো বিপর্যয়ে একজন মাশরাফি জ্বলে ওঠেন নিজে, জ্বলে ওঠান সহযোদ্ধাদের। একজন অভিভাবকের মত আগলে রেখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। তার ভক্ত-সমর্থকরাও গ্যালারিতে কন্ঠঝড় তোলের মাশরাফি, মাশরাফি স্লোগানে।

বাইশ গজে এই সাফল্য ব্যর্থতার ভিড়ে মাশরাফির পথচলার এই বিশ বছরে বঙ্গ ক্রিকেটে কতজনই এসেছে, আবার কালের বিবর্তনে তারা হারিয়েও গিয়েছে। কিন্তু নড়াইল এক্সপ্রেস থেকে গিয়েছেন কলার উঁচু করে প্রতিপক্ষের শিবিরে কাঁপুনি ধরাতে।

একজন মাশরাফি ভাঙা গড়ার এই খেলায় নেতা হয়েছেন বাইশ গজে, হয়েছেন প্রিয় বঙ্গ দেশের মানুষদের মনের কোঠায়। বল ব্যাট বাদ দিয়ে একজন মানুষ মাশরাফিও নেতা হয়েছেন রাজনৈতিক জীবনে। আর জীবনের এই ভালো মন্দ সব রূপের স্বাক্ষী হয়ে ৩৭ বসন্ত পার করে আসা এই মাশরাফি নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৩ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ৫ই অক্টোবর। তবে, মজার ব্যাপার হচ্ছে ২০১৪ সালের ঠিক আজকের দিনেই জন্ম হয় মাশরাফির ছেলে সাহেলের। প্রিয় মাশরাফি আপনার ৩৭তম জন্মদিবসের শুভেচ্ছা নিয়েন। আর জুনিয়রকে দিয়েন তার ৬ষ্ঠ জন্মদিবসের ভালবাসা।

শুভ জন্মদিন মাশরাফি…
শুভ জন্মদিন মাশরাফি জুনিয়র…

লিখেছেনঃ হৃদয় সাহা