প্যাকার সার্কাস ( বিশ্ব ক্রিকেটকে বদলে দেবার ইতিহাস)

0
444

 

ক্রিকেটে রঙ্গিন পোষাক ঠিক কিভাবে আসল? সাদা বলের খেলাই বা কিভাবে চালু হলো,ফ্লাড লাইটের আলো, দিবা-রাত্রির ম্যাচ? ফিল্ডিং রেস্টিকশন, হেলমেট ব্যবহার! কেমন ছিল আগের ক্রিকেটারদের আয়। ক্রিকেট কি আগে আসলে এতটা বানিজ্যিক ছিল? এসব ই জানব আজকের আলোচনায়।

ক্যারি প্যাকার

ক্যারি ফ্রান্সিস বুলমোর প্যাকার

জন্ম– ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৭

সিডনি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রলীয়া

একজন বিশাল ধনকুবের ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তার বাবা মৃত্যুবরণ করলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার সম্পত্তি পান ক্যারি প্যাকার। ক্রিকেটের মানুষ না হয়েও আমূলে পাল্টে দিয়েছিলেন ক্রিকেটকে। তিনি প্রথম দেখিয়েছেন ক্রিকেটের সম্প্রচার আসলে পন্য হতে পারে। উত্তরাধিকার সূত্রে ক্যারি প্যাকার ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান টিভি চ্যালেন নাইনের সত্বাধীকারি।

 

তিনি এবিসিকে (অস্ট্রেলীয়ান ক্রিকেট বোর্ড) তিন বছরের জন্যে A$১.৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের বিনিময়ে ক্রিকেট সম্প্রচারের চুক্তির প্রস্তাবনা দেন। এ প্রস্তাবটি পূর্ববর্তী চুক্তির আটগুণ বেশি ছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যাত হন। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত চ্যানেলের দিকে এসিবি ঝুঁকেছিল বেশি। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এবিসি বিশ বছর ধরে খেলাটি সম্প্রচার করে আসছিল।

আর এ ঘটনায় প্যাকার খুবই রাগান্বিত হয়। তিনি এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে অস্ট্রেলীয়া , ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার ( যদিও তখন দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটে নিষিদ্ধ ছিল) খেলোয়াড়দের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এবং নিজেস্ব ক্রিকেট সিরিজ চালু করেন তার নাম দেন বিশ্ব ক্রিকেট সিরিজ (WSC-World Series Cricket)।

খেলোয়াড়দের মধ্যে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক টনি গ্রেগ, ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড, অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল, পাকিস্তানের ইমরান খান (তিনি তখনো পাকিস্তানের অধিনায়ক হন নি) ও সাবেক অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। অবসর নেওয়া গ্রেগ চ্যাপেল কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া বিশ্বের অন্যান দেশের খেলোয়াড় দের সাথে চুক্তি করেন। টনি গ্রেগের মাধ্যমে ইংলিশ অন্যান খেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করেন। এবং ইয়েন চ্যপেলের মাধ্যমে অস্ট্রেলীয় খেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করান।

ঐ সময়ে ১৯৭৭ সালে অস্ট্রেলীয়া দল ইংল্যান্ড সফরে ছিল। প্যাকারের এই চুক্তির ঘটনা কোন ভাবে অস্ট্রেলীয়া সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। অস্ট্রেলীয়ান দলের ১৭ জনের মধ্যে ১৩ জন ই প্যাকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ছিল। এ ঘটনার সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস হাওয়ার পর বিশ্ব রক্ষনশীল ক্রিকেটের কাছে খুবই সমালোচনার মুখোমুখি হয়। ইংরেজি সমালোচকরা খুব বিরূপ মনোভাব পোষণ করে এবং বিদ্রুপাকারে এর নাম দেয় প্যাকারের সার্কাস।

যে সব খেলোয়াড়রা প্যাকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল তারা অচিরেই জাতীয় দল ও প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়। টনি গ্রেগ কেন্দ্রীয় ভুমিকায় থাকার দরুন তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

শতবার্ষিকী টেষ্ট খেলা ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত হবার কথা ঐ বছরই।প্যাকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় খেলোয়াড়দের মাঝে বিভাজন দেখা যায় এবং আরো খেলোয়াড়রা নিষিদ্ধ হবার কারনে অস্ট্রেলীয়ানরা খুব সাদামাটা পারর্ফম করে। এবং সিরিজ ৩-০ তে হেরে যায়।

প্যাকারের সিরিজে খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করতে পারা এবং সিরিজ সফল হবার অন্যতম কারণ ছিল তখনকার খেলোয়াড়রা আশানুরূপ পারিশ্রমিক না পাওয়া। এবং ঐ সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কমিশনে (এবিসি) অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সম্প্রচারসত্ত্বকে ব্যাপকভাবে কেরি প্যাকারের ইচ্ছার মাধ্যমে পরিচালনার নিশ্চয়তা পাওয়া।

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড এক সাক্ষাৎকারে ক্যারিবীয় দল ত্যাগ করে প্যাকারের দলে যোগদানের বিষয় তুলে ধরেন। লয়েড বলেন যে, এটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনধারন করা সম্ভব হবে। ঐ সাক্ষাৎকারের ফলে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জসহ ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয় । এর মাধ্যমে সবাই বুঝতে পারে যে এটি কারো একক ইচ্ছের ফল সফলতার মুখ দেখতে যাচ্ছে।

WSC এর টেষ্ট ম্যাচ গুলিকে বলা হত সুপার টেষ্ট কারন এসিবির সাথে দ্বন্দের কারনে টেষ্ট নাম তারা ব্যবহার করতে পারবে না। এবং এমসিসর প্রচলিত নিয়মে খেলা পরিচালনা করতে পারবে না।

প্যাকার টেষ্ট সিরিজের পাশাপাশি ওয়ানডে খেলা চালু করে প্রথম দিবা রাত্রির ম্যাচ, ফ্লাড লাইটের আলোতে সাদা বলে এই সিরিজে চালু হয়। সবুজ মাঠে সাদা পোশাকের পরিবর্তে রঙিন পোশাকে খেলা এই সিরিজে চালু হয়। সকলের মাথায় হেলমেট, পেইজ বলারদের আধিপত্য, এ্যটাকিং ফিল্ডিং, ব্যাটসম্যানদের ধুন্ধুমার মার কালো সাইড স্ক্রিনের ব্যবহার সব কিছু ওয়ার্ল্ড সিরিজে প্রবর্তন করে। ১৩ টি ক্যামেরা দ্বারা সরাসরি জমকালো খেলা সম্প্রচার অন্যতম আকর্ষণ ছিলএই সিরিজের। ফিল্ডিং রেসট্রিকশন ড্রপ ইন পিচ (অন্য জায়গায় পিচ তৈরি করে উঠিয়ে এনে বসানো) ১৯৭৭-১৯৭৯ পর্যন্ত এই সিরিজ চলেছিল।

আজকের আধুনিক ক্রিকেটের অনেক কিছুই প্রথম প্যাকর সিরিজের আবিষ্কার। প্যাকার আসলে অস্ট্রলীয় ক্রিকেটের পাশাপাশি আইসিসি র ও চক্ষুসূল হয়ে ছিল। ৯ মে ১৯৭৭ প্রথম চালু হয় প্যাকার সিরিজ যা বিশ্ব ক্রিকেটকে একদম নড়বরে করে দিয়েছিল।

বিশ্বের আর কোন ঘটনা ক্রিকেটকে এভাবে নাড়া দিতে পারেনি। টনি গ্রেগ আগা গোড়া প্যাকারের সংঙ্গী হিসেবে ছিলেন। এই ঘটনায় তাকে বরখাস্ত হতে হয়েছিল আর কখনোই ফিরতে পারেননি ক্রিকেটে। যদিও চ্যানেন নাইনে তার চাকরি ছিল। প্যাকারের সাথে তার কোর্টে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে।

তারা যে মাঠে খেলা শুরু করেছিল সেটিতে আসলে পিচ ভাল ছিল না তাই এত অল্প সময়ে কিভাবে পিচ তৈরি করবে সেটি একটি সমস্যা ছিল। তাই মাঠের বাইরে পিচ তৈরি করে ক্রেনের সাহায্যে মাঠে এনে বসানার প্লান করে। আর এই পিচে বল গুলি এত গতিতে আসত খেলতে খুবই বেগ পেতে হত। অস্ট্রেলীয় ডেভিড হুকস এন্টি রবার্টের বলে চেয়ালে আঘাত প্রাপ্ত হন। এবং চেয়ালে ভেঙ্গে যায়। প্রথমবার তাই সবাই হেলমেটের ব্যবহার শুরু হল। যদিও ইংলিশ ব্যাটসম্যান ডেনিস অ্যামিস মটরসাইকেলের হেলমেট ব্যাবহার করত। তার অনুসরনে সবাই হেলমেটের ব্যবহার শুরু করে।

আইসিসির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঝকঝকে সম্প্রচার  কিংবদন্তি রিচিবেনের ধারাবর্ণনা মানুষের মনে লেগে গেলো। ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে। পুরনো ধারনা ভেঙে দিয়ে নতুন ধারার ক্রিকেট মানুষের মন জয় করল। যে আধুনিক ক্রিকেট আমরা দেখি তা এই বিপ্লবী প্যাকারের কল্যনে।

এই সিরিজের ম্যাচ গুলি পায়নি কোন প্রথম শ্রেনীর সন্মান। তাতে কি যায় আসে সম্প্রচার বা বিপণন বলুন। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বলুন। এই সিরিজের পর আমুলে পাল্টে গিয়েছে।

শেষটা না বললেই নয় ১৯৭৯ সালে এবিসি দারুন আর্থিক সংকট পরে। এবং এসিবির সভাপতি বব পারিশ ক্যেরি প্যাকারের সাথে কয়েক দফায় বৈঠকে বসেন। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের স্বার্থে একটা সমঝোতায় আসা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ৩০ মে ১৯৭৯ বডব পারিশ বিবাদ অবসানের ঘোষণা দেন।

ক্রিকেট ভক্তদের কাছে এটি বিষ্ময়কর খবর ছিল। অস্ট্রেলীয়ান ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্ত চ্যানেল নাইন পায়। এবিসি ও ইংল্যান্ডে ক্রিকেট আর্থিক দুরাবস্থার কথা আইসিসি কে বলে। আইসিসি তাদের যথেষ্ট সহায়তা প্রদান করে। ‎

ক্যারি প্যাকার আসলে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন ক্রিকেট বোর্ডেকে। এবং সেটিতে তিনি সফলও হয়েছেন। আধুনিক ক্রিকেটে ক্যারি পাকারের অবদান চাইলেও অস্বীকার কেউ করতে পারবে না।