বলছি কিংবদন্তি ক্রিকেটার জ্যাক ক্যালিসের কথা

0
2719

সব্যসাচী শব্দের অর্থ কি?
– বাংলা অভিধান ঘাটলে সহজেই পাবেন এর অর্থ। যার অর্থ দাঁড়ায় দু’হাতেই সমানভাবে কাজ করতে পারদর্শী! ক্রিকেটেও এমন অনেক সব্যসাচী খুঁজে পাওয়া যায়, যাদেরকে আমি বা আমরা বলে থাকি অলরাউন্ডার। অনেকের কাছেই ক্রিকেটটা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার ফলে ব্যক্তিজীবনে কেউ অনেক গুণে গুণান্বিত হলে আমরা তাকে বানিয়ে ফেলি অলরাউন্ডার!!
আর অলরাউন্ডারদের অলরাউন্ডার? কিংবা সব্যসাচীদের মধ্যে যিনি সেরা? কারা তারা? একজনের নাম চাইলেই বলা যায়, জ্যাক ক্যালিস! যিনি কিনা চাইলেই পৃথিবীর যেকোনো দলেই শুধুমাত্র প্রফেশনাল বোলার, ব্যাটসম্যান কিংবা শুধুই ফিল্ডার হিসেবে খেলতে পারতেন!!

সেরা শব্দটাই যখন আসলো তখন ক্রিকেটে সেরাদের একটা মানদন্ড হিসাব করা যাক! ক্রিকেটে কি আদৌ সেরা হওয়ার কোনো মানদন্ড আছে? সত্যি বলতে কি করলে তিনি নিজ ক্ষেত্রে সেরা হবেন? কেননা এখানে আজন্ম কেউ সেরা থাকেননা, এটা এমন একটা যুদ্ধমঞ্চ যে মঞ্চে শুধুই চলে ছাড়িয়ে-ছাপিয়ে যাওয়ার খেলা। তবুও কিছু মানুষ তাদের মেধার বলে ছাপ রেখে যান। আসলে ক্রিকেটে সেরা বা শ্রেষ্ঠ শব্দটির কোনো বিশেষায়িত সংজ্ঞা নেই। তাই একমাত্র ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে ব্যাটিং ঈশ্বর স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ব্যতীত আর কাউকেই এক শব্দে সেরা বলার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন মত, বিভিন্ন মানদন্ড ও বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুযায়ী সেরা মানা হয় আলাদা আলাদা ক্রিকেটারদের। যুদ্ধও চলে অনেকের মধ্যে। এই শতাব্দীর শুরুর দশক দেখেছে ক্রিকেটে সেরাদের রাজত্ব। তর্ক চলেছে, চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে। তবুও থামেনি এই যুদ্ধ। শচীন নাকি লারা? মুরালি নাকি ওয়ার্ন? ম্যাকগ্রা নাকি ওয়াসিম? জ্যাক ক্যালিস নাকি…? এই একটা ক্ষেত্রে এসেই ক্রিকেট আজো পায় নি তার যোগ্য প্ৰতিদ্বন্দী!

যে কারণে ক্রিকেটের ইতিহাসে ব্যাটিংয়ের প্রায় সব রেকর্ড শচীন টেন্ডুলকারের নামের পাশে থাকলেও ব্রায়ান লারাকেই সেরা মানেন অনেকে। যে কারণে মুরালি সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী হলেও মানুষ সেরা মনে করে ওয়ার্নকে। এর কারণ শুধুই ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড ও পরিস্থিতি। তেমনিভাবে যখন আলোচনা করা হয় ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারদের ব্যাপারে, তখন চলে আসে স্যার গ্যারি সোবার্স, স্যার রিচার্ড হ্যাডলি, ইমরান খান, জ্যাক ক্যালিসদের নাম। এদের মধ্যে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার কে তা নিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরাও কখনো ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেন না। তবে যখন মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করানো হয় পরিসংখ্যান, তখন সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিতে বাধ্য যে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার দক্ষিণ আফ্রিকান ডানহাতি পেস বোলিং অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস।

আপনার ধুন্ধুমার টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট পছন্দ? চাইলেই দেখতে পারেন ক্যালিসের খেলা। আপনার ধৈর্যের বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভালো লাগে? তাহলেও আশ্রয় নেন সেই ক্যালিসেই। এ যেন টু ইন ওয়ান। আর আমার ভাষায় অল ইন ওয়ান। নেভিল কার্ডাসের ভাষায় পরিসংখ্যান নাকি আস্ত এক গাঁধা। অর্থাৎ আপনি পরিসংখ্যান দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করতে পারবেন না। কিন্তু জ্যাক ক্যালিসকে নিয়ে সমস্যাটা হল তাকে নিয়ে কথা বলতে গেলে সবাইকে আশ্রয় নিতে হয় সেই পরিসংখ্যানের খাতায়। কেননা মানুষ যে ফ্লেভার পেতে ক্রিকেট ফলো করে, ক্রিকেট ,ক্রিকেটেই ঘুমায় হয়তোবা ক্যালিস দর্শকদের সেই ফ্লেবারটা কখনোই দিতে পারেন নি। তাতে কি? নিরবে-নিভৃতে পারফর্ম করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। যেখানে ওঠার সাধ্য এখন পর্যন্ত দেখিয়েছেন শুধুই তিনি! তার ব্যাটিং একশভাগ টেক্সটবুক- চোখের আড়ালে আড়ালে থেকেই তাই দুই ধরণের ক্রিকেটে দশ হাজারের ওপরে রান তার। সেই ব্যাটিং চোখ ধাঁধায় না, কিন্তু রান আনে প্রচুর। সেই ব্যাটিং দেখে আপনি হাতে তালি হয়তো দিবেন না, মনে প্রশান্তির বাতাস বইতে শুরু করবে, আচমকা তার মাটি কামড়ানো কভার ড্রাইভ দেখে আনমনে বলে উঠবেন, “ওয়াও”! তার ব্যাটিং বোলারদের রাতের ঘুম হারাম করে না ঠিকই, তবে নীরবে কাঁদায়! কিন্ত তার সময়ের সব বোলাররাই বলবে তার উইকেট কতটা প্রাইসলেস! বোলিংটাও একেবারে আহামরি ছিল না। টিপিক্যাল ফাস্ট মিডিয়াম বোলারের দীর্ঘ রানআপ, সাধারণ হাই আর্ম একশন, এভারেজ গতি, সামান্য সুইং আর সেই সঙ্গে ব্যাটসম্যানদের গলার কাটা হিসেবে ছিল হঠাৎ হটাৎ কিছু রাইজিং ডেলিভারি! তবে তার মূল শক্তি ছিল এক জায়গায় অনবরত বল করে যাওয়া। এভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পেয়েছেন কতশত উইকেট। জ্যাক ক্যালিসের ক্যারিয়ার বুঝি তাই স্রেফ কিছু সংখ্যাই। তার ম্যাজিক নেই, ক্যারিশমা নেই, দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলার মত কিছু জেতাতে পারেন নি তিনি কখনই। তাই সর্বকালের সেরা টেস্ট বা ওয়ানডে টিমে তার নাম আসে না, ক্রিকেটপ্রেমিকদের প্রেমিকার স্থানে তাই স্বভাবতই তার জায়গা হয় না! তার নাম বাজারে বিক্রি হয় না চড়া দামে।

যার টেস্টে ব্যাটিং গড় পঞ্চান্নের ওপর, সবরকম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ষাটটার ওপর সেঞ্চুরি, পঁচিশ হাজারের বেশি রান, তাকে আপনি নিঃসন্দেহে সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে চোখ বন্ধ করে মেনে নেবেন। যিনি কিনা যোগ্যতা রাখতেন শুধুমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার। আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব মিলিয়ে পৌনে ছয়শ উইকেট একজন বোলারের, ওয়ানডে ক্রিকেটের স্বর্ণযুগেও যার ইকোনমি পাঁচের বেশ নীচে এবং টপ অর্ডারের বদান্যতায় শক্তভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া কোন দলের মিডল অর্ডারকে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বলে কোমর ভেঙ্গে দেয়া যার কাছে ডালভাতের মত নিয়মিত ব্যাপার, তাকে দলের যেকোন প্রয়োজনে আপনি মনে করবেন পরম নির্ভরতায়। এই তো দুই ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্যের জানান দিলেন, অন্য ক্ষেত্রে? যোগ করুন কয়েকশো ক্যাচ! এবার তিনটাকেই একসঙ্গে মেলান, যা পাবেন সেটাকে টিপিক্যাল ক্রিকেটীয় নিয়মে ফেলার ক্ষমতা নেই কারো! এমন খেলোয়াড় একটা জেনারেশনে একজনও আসে কিনা সন্দেহ। অলরাউন্ডার শব্দটাও যায় না ঠিক তার সাথে! টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে তার সাথে এক ব্র্যাকেটে রাখবেন এমন খেলোয়াড় যখন আপনি তিন চারজনের বেশি পাবেন না, তখনই বুঝবেন আপনি একজন কিংবদন্তিকে দেখছেন চোখের সামনে।

শুভ জন্মদিন অলরাউন্ডারদের অলরাউন্ডার! মি. সব্যসাচী