“মহেন্দ্র সিং ধোনি- এ ক্যাপ্টেন, দ্যা ক্যাপ্টেন!”

0
1991

ক্রিকেটের মহামঞ্চ বিশ্বকাপ! বৈশ্বিক আসরের পূর্নতা বিশ্বকাপ ফাইনালে। বাইশগজে তিন কাঠির সামনে চলে ব্যাট-বলের লড়াই, মাঠের যুদ্ধ ছাপিয়ে লড়াই চলে বাইরের দুনিয়ায়। চায়ের কাপে ওঠে ঝড়! গ্যালারি-ড্রেসিংরুম অনবরত কাঁপে চাপা উত্তেজনায়! বাইশগজে চলছে রুদ্ধশ্বাস। যে লড়াইয়ে কখনো কখনো সেনাপতি সৈন্যদের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের বুকে, কখনো একা হাতে লড়ে যান সেনাপতি। কখনো লড়াইয়ে বুক পেতে দেন সেনাপতি, এগিয়ে আসেন যুদ্ধমঞ্চের দিকে, চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, বুকভরা অদম্য সাহস কাবু করতে পারে না প্রতিপক্ষের কোনো চোখরাঙানি! ফলাফল- আরেকটি যুদ্ধজয়!

দুই এপ্রিল, ২০১১!
আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল। মুম্বাইয়ে সেদিন উৎসবের আমেজ। ভারত যে আটাশ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে। কমেন্ট্রি বক্সে ঝরছে রবি শাস্ত্রীর আগুন, ‘Dhoni finishes off in style. A magnificent strike into the Crowd . India lifts the world cup after 28 years. Party Started at dressing room. And its an Indian captain who’s been absolutely magnificent in the night of the final’

আরেকটু পিছনে ফিরে যাওয়া যাক, পুরো ক্রিকেটবিশ্বের দুই চোখ তখন নিমজ্জিত ওয়াংখেড়ের বাইশগজে। বিশ্বকাপের সেই আরাধ্য শিরোপা থেকে ভারত যে তখন মাত্র চার রান দূরে। বল বাকি আছে ১১টি! স্ট্রাইকপ্রান্তে ৭৮ বলে ৮৫ রানে অপরাজিত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। বোলিং প্রান্তে নুয়ান কুলাসেকারা। ধোনি স্ট্যান্স নিলেন, কুলাসেকারা দৌড় শুরু করলেন। তার ইয়র্কারের ব্যর্থ চেষ্টা পরিণত হলো ফুল লেংথে। তার সেই ফুল লেংথ বলে ধোনির ‘রিবুক’ ব্যাটের দৃঢ় এক চুম্বন! ধোনির হ্যালিকপ্টর শটের ছোঁয়ায় সাদা কোকাবুরার ঠিকানা তখন লং অনের উপর দিয়ে ওয়াংখেড়ের সেকেন্ড টিয়ারে! কুলাসেকারার ফলো থ্রু আর উড়ন্ত কোকাবুরার দিকে ধোনির নজর যেতে না যেতেই পুরো ওয়াংখেড়ের বাঁধন হারা চিৎকার! ধোনির মনের ভিতরে যে গিটার আছে, তখন সেই গিটারের ছয় তারে এক সুর তুলেছে, ” এ তোর জীবনের সেরা ছক্কা মাহি, এ ছক্কা আজীবন তোকে বিশ্বজয়ের গান শুনাবে!”

এতক্ষন মাথার পাশে সটান করে ধরে রেখেছিলেন ব্যাটটাকে! এবার ব্যাটটাকে উপরের দিকে উঠিয়ে দু’বার ঘুরালেন, বগলদাবা করলেন স্ট্যাম্প, তারপর হাটা ধরলেন ড্রেসিংরুমের দিকে! একদম নায়কের বেশে, নেতার বেশে! আর সে থেকেই ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের তো বটেই এটা হয়ে গেল বৈশ্বিক ক্রিকেটের সবচেয়ে আইকনিক ছবিগুলোর একটা! ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত, তাও ঘরের মাঠে।

সকালের সূর্য যে সবসময়ই পুরো দিনের পূর্বাভাস দিবে এমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই! সেবার গোটা টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে ধোনি ছিলেন নিষ্প্রাণ-নিষ্প্রভ। মুম্বাইয়ের ফাইনালের আগে সাত ইনিংসে পঁচিশ গড়ে সর্বসাকুল্যে ধোনির সংগ্রহে ছিল ঠিক দেড়শ রান! হায়েস্ট স্কোর ছিল ৩৪! হায় হায় রব উঠল সবজায়গায়। শুরু হলো পত্রিকায় সমালোচনা। ধোনি পত্র-পত্রিকার সকল সমালোচনা-উপহাসের জবাব দিলেন, মুম্বাইয়ের সেই ফাইনালে খেললেন ঝকঝকে সেই ইনিংস। কিছু না বলেও যেন অনেককিছু বললেন!

পুরো ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল ধোনির, সমালোচনার অগ্নিবানে বিদ্ধ হয়েছেন বহুবার। তবুও প্রতিবার ফিরে এসেছেন আগের থেকেও ভয়ংকররূপে! প্রতিটা সমালোচনার জবাব দিয়েছেন উইলো দিয়ে! বিপদের মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। এর জন্য ক্রিকেট পাড়ায় তিনি সমাদৃত “ক্যাপ্টেন কুল” নামে! ঝিঁঝিঁপোকার প্ৰতিশব্দে নামাঙ্কিত ক্রিকেটে যুগে যুগে যত রথী মহারথীরা এসেছেন তাদের মধ্যে সর্বকালের অন্যতম সেরা অধিনায়ক মাহি। অনেকের কাছে তো তিনিই সর্বকালের সেরা! তবে যারা তাকে সর্বকালের সেরা বলবেন তাদের কাছেও যুক্তির অভাব নেই।

বিশ্বের একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন আইসিসির সকল ট্রফি। ভারতকে জিতিয়েছেন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, আটাশ বছরের আক্ষেপের পর জিতিয়েছিলেন ওয়ানডে বিশ্বকাপ, সেই জয়যাত্রা অব্যহত রেখে জিতেছিলেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। তার অধিনায়কত্বেই ভারত টেস্টের র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে উঠে এসেছিল।
২০০৯ সালে ক্রিকেটের বাইবেল নামে পরিচিত উইজডেনের স্বপ্নের টেস্ট একাদশের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষিত হন।
তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে আইসিসি একদিনের ক্রিকেটের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান।
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রেটিংয়ে জানুয়ারী ২০১০ সালে ধোনী সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিংধারী খেলোয়াড়ের অধিকারী ছিলেন।

১৯৮১ সালের আজকের দিনে রাঁচিতে জন্মগ্রহণ করেন ধোনি। ক্রিকেট দুনিয়া যখনই কোনো দলনেতার ঠান্ডা মাথার খুনে ইনিংস দেখবে, তখনই চোখে ভাসবে একটাই নাম! যখনই কোনো ক্যাপ্টেন কোনো ফিল্ডার চেঞ্জ করার পরের বলেই সেই ফিল্ডার ক্যাচ নিবে তখনই মনে পড়বে একটাই নাম।
আই রিমেম্বার দ্যা নেইম, ডু ইউ রিমেম্বার?
– মহেন্দ্র সিং ধোনি; এ ক্যাপ্টেন, দ্যা ক্যাপ্টেন!
শুভ জন্মদিন মহেন্দ্র সিং ধোনি!

লিখেছেনঃ আসিফ আফনান পিয়াল