লেসলি হিলটনঃ ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার

0
1893

শরীরে ৭ টি বুলেটের আঘাত নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর শুয়ে আছেন Lurline Rose । তার হত্যাকারী স্বামী নিজেই পুলিশকে ফোন করে ঘটনা জানান। পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়৷ আসামীর অপরাধ নিয়ে জুরি বেঞ্চের মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও অনেকের চোখে “পক্ষপাতদুষ্ট” এক বিচারক Justice Colin MacGregor তাকে ফাঁসির রায় দেন। এমনকি জনগণের সহমর্মিতাও হত্যাকারীর পক্ষেই ছিলো। রায়ের কিছুদিন পর ফাঁসি হয়ে যায় সেই হত্যাকারী Leslie George Hylton এর, ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ফাঁসিকাষ্ঠের মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। আসুন ঘুরে আসি ক্রিকেট ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায় থেকে।

লেসলি হিলটন ১৯০৫ সালে জ্যামাইকার এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার বয়স যখন মাত্র ৩ বছর তিনি বাবা-মা উভয়কেই হারান৷ এরপর বড় বোনের কাছে থাকা শুরু করেন। কিন্তু ১২ বছর বয়সে তার বোন ও মৃত্যুবরণ করলে পৃথিবীতে তিনি একদম একা হয়ে যান পড়েন। বাধ্য হয়েই পড়ালেখা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে প্রথমে দর্জি ও পরে জাহাজঘাটে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন।

এরই ফাঁকে ক্রিকেট খেলার প্রতি তার ভালোবাসা ও মেধা তাকে জ্যামাইকার ক্রিকেটে পরিচিত মুখ হিসেবে গড়ে তোলে। ১৯৩৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে টেস্টে এই দীর্ঘকায় ফাস্ট বোলারের অভিষেক হয়। শুরুর দিকে প্রতিভার ঝলক দেখালেও সেটা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ১৯৩৯ সালে যখন তিনি অবসর নেন তখন খেলেছিলেন মাত্র ৬ টেস্ট, যাতে উইকেট সংখ্যা ছিলো ১৬ টি।

অবসরের পর ১৯৪২ সালে হিলটন বিয়ে করেন লারলিন রোজকে, তাদের একটি পুত্র সন্তান হয় ১৯৪৭ সালে। লারলিনের উচ্চাকাঙ্খা ছিলো ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার। হিলটন ও স্ত্রীর ইচ্ছায় বাঁধা দেন নি৷ তাই ফ্যাশন স্কুলে পড়ার জন্য লারলিন দীর্ঘসময় ধরে আমেরিকার নিউইয়র্কে থাকা শুরু করলেন। মাঝে মাঝে তিনি জ্যামাইকায় আসতেন, আবার নিউইয়র্কে চলে যেতেন।

এরই মধ্যে একদিন হিলটনের কাছে আমেরিকা থেকে একটি অজ্ঞাতনামা চিঠি আসলো। চিঠিতে বলা হয় যে হিলটনের স্ত্রী নিউইয়র্কে একজন কুখ্যাত প্লেবয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। চিঠি পেয়ে ক্রোধান্বিত হিলটন সেটা তার শ্বশুড়বাড়ির লোকদের দেখান আর স্ত্রীকে টেলিগ্রাম করেন যাতে এক্ষুণি বাড়ি চলে আসে৷ তাড়া দেয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে লারলিন ১ মাস পর বাসায় আসে। বাসায় আসার পর হিলটন যখন তাকে চিঠির অভিযোগের সত্যতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তখন লারলিন তা অকপটে অস্বীকার করেন। হিলটনও স্ত্রীর কথায় বিশ্বাস করে এই নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করেননি।

৩ দিন পর লারলিন যখন তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠাচ্ছিলো তখন সেটা হিলটনের হাতে এসে পড়ে ঘটনাক্রমে। অকাট্য প্রমাণ নিয়ে হিলটন যখন স্ত্রীকে আবার জেরা করেন তখন তার স্ত্রী তা স্বীকার করেন আর হিলটনের নামে এমন কিছু কথা বলেন যাতে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।

চিঠিতে প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসার কথার পাশাপাশি লারলিন লিখেছিলেন হিলটনের ভালোবাসায় নাকি তার বমি চলে আসে! লারলিন হিলটনকে আরো বলেন তার জন্ম নিম্ন বংশের পরিবারে আর সে দেখতে কুৎসিত। আরো অনেক বাজে কথা তিনি হিলটনকে বলতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডা হতে থাকে আর একটু পর গুলির আওয়াজ শোনা যায়৷ পুলিশ এসে পরে লারলিনের লাশ উদ্ধার করে।

নিজের ডিফেন্সে হিলটন আদালতে বলেছিলেন যে তার স্ত্রীই তাকে প্রথমে গুলি করতে নেয় কিন্তু তিনি তা কেড়ে নিয়ে গুলি করেন সেল্ফ ডিফেন্স হিসেবে। কিন্তু তার এই যুক্তি উড়িয়ে দেয়া হয় যেহেতু রিভলভারে ৬ টি গুলি থাকে একসাথে আর লারলিনের দেহে গুলি ছিলো ৭ টি৷ তার মানে স্বজ্ঞানে রিভলবার আবার লোড করে হিলটন খুন করেন। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট হিলটনের বক্তব্যকে সমর্থন করে।

এই হত্যার বিচারক কলিন ম্যাকগ্রেগর ছিলেন একজন বিতর্কিত মানুষ, যিনি জাতপাত নিয়ে নাক সিঁটকাতেন। অল্প শিক্ষিত হিলটনকে বারবার তিনি ধমক দিয়ে তার জেরায় দ্বিধান্বিত আর অসহায় করে তুলেছিলেন। যদিও সকল তথ্যপ্রমাণ আর জুরি বেঞ্চের রায় হিলটনের পক্ষে ছিলো তবুও কোন “বেনিফিট অফ ডাউট” না দিয়ে সকলকে অবাক করে তিনি তাকে ফাঁসির আদেশ দেন। ফাঁসির রায়ে তার করা মন্তব্য পরবর্তীতে সমালোচনার ঝড় তোলে।

অবশেষে ১৯৫৫ সালের ১৭ মে এর ঝলমলে সকালে লেসলি হিলটনের ফাঁসি কার্যকর হয়। জন্ম থেকেই কষ্ট আর যন্ত্রণা যার সঙ্গী ছিলো, মৃত্যুতেও সেই কষ্ট নিয়েই তিনি পাড়ি জমিয়েছেনে এক অনন্ত ভূবনে৷ যেখানে তাকে কষ্ট দেয়ার কিছু থাকবে না। তাই হয়তো ব্রিটিশ বিজ্ঞানী থমাস ব্রাউন বলেছেন – “Death is the cure for all diseases”!

লেখকঃ সাজ্জাদুল কাদের