১৪ বছর পেরিয়ে ১৫তে সাকিব আল হাসান

0
1319

মাগুরার আলোকদিয়া, টেপটেনিস বলে খ্যাপ খেলতে গিয়েছে এক বালক! বালকের বাঁহাতি মিডিয়াম পেস বোলিংয়ে মুগ্ধ হন ওই ম্যাচের আম্পায়ার। মুগ্ধতার ফলস্বরূপ সেই বালককে প্রস্তাব দিলেন নিজের   ক্লাবে খেলার! পরেরদিন নির্দিষ্ট সময়ে প্র্যাকটিসে আসতেও বললেন! সেই বালকটি আজকের সাকিব, আমাদের সাকিব! হাসিমুখে প্রস্তাব মেনে নেন সাকিব!   সাকিবের খেলা দেখে সেই ম্যাচের যে আম্পায়ার তাকে নিজের ক্লাবে খেলার আমন্ত্রণ জানান তিনি সাদ্দাম হোসেন গোর্কি! পরেরদিন বিকেলে প্রথমবার প্র্যাকটিসে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার প্র্যাকটিস দেখে সাকিব, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায়! দ্বিতীয়দিন প্র্যাকটিসে আসে সাকিব, এবার সাদ্দাম হোসেন সাকিবকে জিজ্ঞেস করলেন, “কালকে আসিস নি কেনো?”

তারপর বল তুলে দিলেন সাকিবের হাতে!  বল হাতে নিয়ে কয়েকটা পেস বল করলেন সাকিব, তারপর শখের বাঁহাতি স্পিন!  সাকিবকে  শখের স্পিন করতে দেখে বললেন,

“তুই স্পিন বোলিংই কর!”

কদিন পরই স্থানীয় লিগে ম্যাচে খেলতে নামেন সাকিব, নেমেই প্রথম বলেই উইকেট। এটা ছিল ক্রিকেট বলে খেলা সাকিবের প্রথম ম্যাচ!  সাকিব এর আগে ক্রিকেট যা খেলেছেন, সবই টেপ টেনিসে, যার মানে ওই উইকেটটা ক্রিকেট বলে করা প্রথম বলেই! সাকিবের ক্ষেত্রে আরেকবার সত্য হল সেই চিরচেনা প্রবাদ,  ” সকালের সূর্য দেখে বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে!”

আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতই বড় হচ্ছিলেন ফয়সাল।ফুটবলার বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেও খেলবে ফুটবল। নিজের স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলার, অপূর্ন সেই স্বপ্নটা পূরণ করতে চেয়েছিলেন ছেলের মাধ্যমে।  কিন্তু এ কি! ছেলের টান যে ব্যাট-বলের দিকে, মানে ক্রিকেটের প্রতিই ঝোঁক ছেলেটির। ছেলে বড় হচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, লেখাপড়া করছে কিন্তু তার মনটা জুড়ে রয়েছে শুধুই ক্রিকেট!  বাংলাদেশের আর দশটা বাবার মতই তাঁর বাবাও চাইতেন ছেলে লেখাপড়া করে বড় চাকুরীজীবী হবে। জেদি বাবার একটাই কথা, করলে পড়ালেখাই করতে হবে!  আর যদি খেলতে হয়ই তাহলে ফুটবলই খেলতে হবে! মানুষ তার জীবনের বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে তার বাবার কাছ থেকে, এখানেও ব্যতিক্রম নয় সাকিব! জেদি বাবার থেকে জেদটাই সবথেকে বেশি পেয়েছেন সাকিব! বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে খেলতে চলে যেতেন সাকিব!   এইজন্য বাবার হাতে  খেতে হয়েছে অনেক মার। শুধু পিটুনিই না, বেশ কয়েকবার ব্যাট কেটে-ভেঙে ও দিয়েছেন তার বাবা। তবুও থেমে থাকেনি ছেলেটি। ক্রিকেটের প্রতি অদম্য অনুরাগ, জেদ থেমে থাকতে দেয়নি তাকে। কারন জেদটা যে তার রক্তে, জেদি বাবাকে নিজের জেদে বশীভূত করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্যমঞ্চে!

একবার হয়েছে কি, সাকিব গিয়েছেন খেলতে! দুপুরে আবার সাকিবের পরীক্ষা! ছেলে বাসায় ফিরছে না দেখে চিন্তিত মা। সাকিব আসতেই সাকিবের ব্যাটটা ভেঙে ফেলেন মা, সাকিব চুপচাপ দৌড় দিলেন পরীক্ষা দিতে! রাতে মাকে বললেন, ” তুমি ব্যাটটা কেন ভাঙলে মা? তুমি বরং আমাকে মারতে! ব্যাটটা আমার অনেক প্রিয়!” নিজের ব্যাটের প্রতি যে প্রিয়তা সেই প্রিয়তা বজায় রেখে চলেছেন আজ পর্যন্ত!

এবার নিজের একটা গল্প বলি, ২০০৮ সাল, ক্লাস টুতে পড়ি! স্কুল থেকে বাসায় ফিরতেছি বড় ভাইয়ের সঙ্গে, বড় ভাইয়া আবার টিভিতে মাত্রই ২০০৫ সালের অস্ট্রেলিয়া বধের ম্যাচ দেখে এসেছে! কার্ডিফের সেই রূপকথা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞতায় বন্দি আমি ভাইয়াকে প্রশ্ন করলাম, ” সাকিব কত করেছে?” ভাইয়া হেসে বলল, ” সাকিব খেলেনি”!  মুহূর্তেই মুখটা কালো আধারে ছেয়ে গেল! সেই মুখে হাসির রেখা দেখা গিয়েছে যখন সেই দিনেই রাতের বেলা পাকিস্তানের বিপক্ষে করাচিতে সেঞ্চুরি করেন সাকিব! দলীয় ২০৮ রানের একারই অবদান ১০৮! সাকিব আমাকে আসলেই বোঝেন!

সেই বছরেরই কথা, এইচএসসি পরীক্ষার জন্য  এশিয়া কাপ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন সাকিব! সেই সংবাদ শুনে নিজের কান্না থামাতে পারি নি! পড়ালেখার প্রসঙ্গ যখন আসলোই, জীবনে কখনো কোনো পরীক্ষায় সাকিব নাকি থার্ড হননি! সবসময় ফার্স্টই হতেন, বড়জোর সেকেন্ড! যেমনটা বাইশ গজের পরীক্ষায় হচ্ছেন!

ছোটবেলায় সবারই স্বপ্ন থাকে, বড় হয়ে আমি এই ‘হবো’, ওই ‘হবো’। তবে বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের পরিবর্তনও ঘটে। সফলতা তাদের বেলাতেই ঘটে যারা নিজের স্বপ্নতে দীর্ঘদিন লালনপালন করতে পারেন, মনে প্রানে ধারণ করতে পারেন!  আর তারা নিজেরাই নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভিন্ন পথ বের করেন।সাকিব আল হাসান তেমনই একজন।  ২০০৬ সালের আজকের দিনে বিশ্বমঞ্চে যে রাজার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল আজকের দিনে তা পৌঁছেছে ১৫ বছরের কোঠায়!  হারারেতে যে সাকিবকে আমরা প্রথম দেখেছি সেই সাকিব এখন আমাদের একান্ত চেনা! হারারে মিরপুর পেরিয়ে সাকিবের রাজত্ব চলুক লর্ডস-মেলবোর্নে! ১৪ বছর আগে অভিষেকেই আলো ছড়ানো সাকিব বার্তা দিয়েছিলেন বহুদূর যাওয়ার,

“তিনি কি পেরেছেন?”