রীতিমতো আগুন নিয়ে খেলছেন রাসেল ডোমিঙ্গো

0
640

আগুন নিয়ে খেললে হয় নিজেকে শেষ হতে হয় নতুবা আশপাশের সবকিছুকে শেষ করে দিতে হয়। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো নেমেছেন সেই খেলাতেই। বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক স্কোয়াডে থাকা একজন ক্রিকেটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তিনি মোটামুটি ড্রেসিংরুমে একটা দেয়াল তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। সবথেকে ভয়ংকর ব্যাপার যেটা সেটা হলো, তিনি তুলনামূলক তরুণদের থেকে সিনিয়রেদের মাঝের বোঝাপড়াতেও কিছু ক্ষেত্রে ঘুন ধরাতে পেরেছেন।

রাসেল ডোমিঙ্গোর নাকি পুরোনো একটা স্বভাব আছে, তিনি যথেষ্ট প্রভাব রাখতে চান এবং এর জন্য তিনি সব পন্থা অবলম্বন করতে রাজী থাকেন। এইরকম রহস্যের কারণেই এর আগে সাউথ আফ্রিকা থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন একবার। বাংলাদেশে এসেও নিজেকে ঠিক শুধরে নিতে পারেননি তিনি। শুরুতে একে একে নিজের সব লক্ষ্য যাতে ঠিক থাকে তার জন্য কোচিং প্যানেলে নিজের পছন্দের মানুষকে দেখতে চেয়েছেন সবসময়।

ব্যাটিং কোচ হিসেবে জেমি সিডন্সকে বিসিবির নামী একজন পরিচালক আনতে চাইলে তার বিরোধিতা করেন এবং সেই পরিচালকের সাথেও কোচের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। শুধু তাই না, জেমিকে পেতে চেয়েছিলেন সিনিয়র ক্রিকেটাররাও কিন্তু তাতে সরাসরি না করে দেন হেড কোচ।

কয়েকজন তরুণ ক্রিকেটারকে সরাসরি আর জাতীয় দলে জায়গা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন হেড কোচ। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার জানান, কয়েকজন ক্রিকেটারকে প্রয়োজনে সিনিয়রকে সরিয়ে তার পজিশনে জায়গা করে দেবেন বলে উসকানি দিয়েছেন হেড কোচ। প্রথমে এই ব্যাপারগুলো ড্রেসিংরুমে ফাঁস না হলেও এগুলো এখন মোটামুটি ভেতরের সবার কাছে ওপেন সিক্রেট। তারপর থেকেই কোচ ড্রেসিংরুমে মোটামুটি অস্বচ্ছ দেয়াল গড়ে ফেলার পথে।

শুরু থেকেই সিনিয়রদের হটানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন হেড কোচ। বিভিন্ন বিদেশ সফরের যে রিপোট তিনি জমা দিয়েছেন সেখানে সিনিয়র ক্রিকেটারদের সরাসরি দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছেন। সিনিয়রদের সরিয়ে বেশ কয়েকবার তরুণ কয়েকজনকে পজিশন বদলানোর জন্য সিলেক্টরদের সাথেও কথা বলেছেন কোচ। যদিও কোচের এইসব কথায় তেমন কোন কান করবার খবর নেই বিসিবি থেকে।

পাকিস্তান সফরেই ড্রেসিংরুমে তিনি সিনিয়রদের দোষ দিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং এই ব্যাপারে জরুরী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে জানান সেখানে। দেশে ফিরে বিসিবির কারও সাথে কথা না বলেই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে অবসর নেবার কথা বলেন তিনি। সেসময় বিষয়টা ভালোভাবে নেননি রিয়াদ। এরপর রিয়াদকে আর দলে রাখা হয়নি। নিউজিল্যান্ড সফরের আগে তিনি সিলেক্টরদের তিন ফরম্যাটের জন্য আলাদা দল গঠনের সুপারিশ করেন।

টি টোয়েন্টি ও ওয়ানডে ফরম্যাটে তিনি সিনিয়রদের মোটামুটি ছেটে ফেলবার পরামর্শ দেন। সাকিব ফেরার পর তিনি সাকিবকে কোনভাবেই তিনে ব্যাটিং করবার পক্ষে নেই, এমনকি বারবার রদবদল করে তিনি টিম মিটিংয়েও সাকিবকে চারে ব্যাট করবার জন্য বলেন। কোচের চাপে অধিনায়ক একটা সিরিজের জন্য সাকিবকে ডাউন বদলাতে বলার পর সাকিব সেটিকে ভালোভাবে নেননি। এমনকি সাকিব পরে ব্যাট করলে দলের ব্যাটিং গভীরতা বাড়বে বলে বারবার টিম মিটিংয়ে বলার পরও কোন সিনিয়র এ ব্যাপারে রাজী না থাকবার কারণে কোচ নাখোশও হন।

এরপর সাকিব আর তিনে ব্যাট করবার কোন ইচ্ছে প্রকাশও করেননি এবং কথা বলেননি এই ব্যাপারে। এমনকি এই সিরিজেও সাকিবকে টানা তিনে নামানো হয়নি কোচের ইচ্ছাতেই। কোচের এহেন সব কাজ এর খবর সভাপতির কাছে পৌছাতে পারার সম্ভাবনার কারণে দলে তিনি দলে ম্যানেজারের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেছেন। খালেদ মাহমুদ সুজনকে সব ক্রিকেটাররা সবসময় দলের ম্যানেজার হিসেবে চাইলেও কোচের আপত্তি ছিল সবসময়ই। দুজনের মধ্যকার দুরত্ব নিয়ে কেউ সরাসরি কথা না বললেও, বেশিরভাগ সিরিজেই আর সুজনকে দেখা যায়নি ম্যানেজার হিসেবে।

চলতি সিরিজে মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে তিনি সংবাদ মাধ্যমে মন্তব্য করবার পর মুশফিক আর এই ফরম্যাটে কিপিং না করবার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, আর সেটিও সেই হেড কোচই বলেছেন। সোহানকে নিয়েই তিনি ফোকাস করছেন বলে জানিয়েছেন। বিশ্বকাপ দলে তামিমকে রেখেই দল সাজিয়েছিল সিলেক্টররা, কিন্তু সেখানে সরাসরি না করে দিয়েছিলেন কোচ। এই কথা কানে যাবার পরই তামিম বিশ্বকাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও প্রেক্ষাপটে কোচ সিনিয়রদের বিপক্ষেই বিভিন্নভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং মন্তব্য করছেন যেটা দল হিসেবে অনেক বাজে প্রভাব ফেলছে। কোন সিনিয়রের সাথেই কোচের সেই ধরনের রসায়ন থাকেছে না। চান্দিকা হাথুরাসিংহার সময়ে কিছু সরাসরি সিদ্ধান্তের কারণে তিনি সিনিয়রেদের সাথে সরাসরি ঝামেলাতে জড়িয়ে পড়েন এরপর তাকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

কোচ হিসেবে রাসেল ডোমিঙ্গো একই পথে হাঁটছেন তবে তিনি সিনিয়রদের সাথে জুনিয়রদের একটা বিভেদ তৈরী করবার অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকে তার পথটা সহজ করবার চেষ্টা করছেন। ২০২৩ সাল অব্দি টানা তিন বিশ্বকাপে নিজের চাকরী সুপ্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাব নিশ্চিত করতেই কি এমন কাজ করছেন তিনি?

তবে ইতিহাস বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে, ক্রিকেটাররাই সবসময় শেষ কথা হিসেবে থেকেছেন। ভালো কোচ হয়েও বিদায় নিয়েছেন জেমি সিডন্স, হাথুরসিংহা। রাসেল ডোমিঙ্গোর কপালেও কি আছে সেটা সময়ই বলে দিবে। তবে বিশ্বকাপ খেলতে যাবার এক মাস আগে এমন অস্থিরতার খেসারত না দিতে হয় খেলার মাঠে সেটা নিয়ে আতংক থাকছেই।